বিশেষ প্রতিবেদন: West Bengal Election 2026 পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ২০২৬ ওয়েস্ট বেঙ্গল ইলেকশন ওয়াচের বিশ্লেষণে বিধায়কগণ অপরাধ, সম্পদ ও শিক্ষাগত ...
বিশেষ প্রতিবেদন:
West Bengal Election 2026
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ২০২৬
ওয়েস্ট বেঙ্গল ইলেকশন ওয়াচের বিশ্লেষণে বিধায়কগণ
অপরাধ, সম্পদ ও শিক্ষাগত যোগ্যতায় নতুন সমীকরণ নিয়ে উঠে এল উদ্বেগজনক একাধিক তথ্য
পশ্চিমবঙ্গের সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী ২৯২ জন বিধায়কের হলফনামা বিশ্লেষণ করে প্রকাশিত হয়েছে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা West Bengal Election Watch এবং সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষক গোষ্ঠীর এই বিশ্লেষণে উঠে এসেছে রাজ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতার এক জটিল চিত্র—যেখানে একদিকে বাড়ছে ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধির সংখ্যা, অন্যদিকে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে কোটিপতি বিধায়কদের হার। একই সঙ্গে নারী প্রতিনিধিত্ব ও শিক্ষাগত অবস্থান নিয়েও সামনে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
অপরাধমূলক মামলায় অভিযুক্ত বিধায়কের সংখ্যা বেড়েছে
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জয়ী ২৯২ জন বিধায়কের মধ্যে ১৯০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। অর্থাৎ মোট বিধায়কের প্রায় ৬৫ শতাংশের বিরুদ্ধে কোনো না কোনো অপরাধমূলক মামলা রয়েছে।
এর মধ্যে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ সংক্রান্ত মামলা রয়েছে ১৭০ জনের বিরুদ্ধে, যা মোট বিধায়কের ৫৮ শতাংশ।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায় এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সে সময় ১৪২ জন বিধায়কের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা এবং ১১৩ জনের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের মামলা ছিল। শতাংশের নিরিখে তা ছিল যথাক্রমে ৪৯ ও ৩৯ শতাংশ।
গুরুতর মামলার প্রকৃতি
প্রতিবেদন অনুযায়ী—
১৪ জন বিধায়কের বিরুদ্ধে খুনের মামলা রয়েছে
৫৪ জনের বিরুদ্ধে খুনের চেষ্টার মামলা
৬৩ জনের বিরুদ্ধে মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধ সংক্রান্ত মামলা
এর মধ্যে ২ জনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে
তবে কোন দলের কোন বিধায়কের বিরুদ্ধে এই নির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তা প্রতিবেদনে আলাদা করে উল্লেখ করা হয়নি।
দলভিত্তিক চিত্র
দলগত নিরিখে সবচেয়ে বেশি ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত বিধায়ক রয়েছে বিজেপিতে।
ফৌজদারি মামলাযুক্ত বিধায়ক
ফৌজদারি মামলায় যুক্ত বিধায়কের মোট সংখ্যা ১৭৭ যার মধ্যে বিজেপি বিধায়ক সংখ্যা ১৫২ তৃণমূল বিধায়ক সংখ্যা ২৫, আই এস এর বিধায়ক সংখ্যা এক বিধায়ক সংখ্যা উন্নত বিধায়ক বিধায়ক সংখ্যা এখানে দেখা যাচ্ছে ফৌজদারি অপরাধীর সঙ্গে যুক্ত বিজেপি বিধায়ক সংখ্যা বেশি।
গুরুতর মামলাযুক্ত বিধায়ক
গুরুতর মামলায় যুক্ত বিধায়কদের মধ্যে বিজেপি বিধায়কের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি। অপরাধের সঙ্গে যুক্ত বিধায়কদের মধ্যে ১৪১ জন বিধায়ক গুরুতর মামলার সঙ্গে যুক্ত।এরপর তৃণমূল বিধায়কের সংখ্যা ২৫ যারা গুরুতর মামলার অভিযুক্ত।এই পরিসংখ্যান রাজনৈতিক মহলে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—দলগুলি কি ক্রমশ “জেতার যোগ্য” প্রার্থীকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে অপরাধমূলক পটভূমিকে উপেক্ষা করছে?
নারী প্রতিনিধিত্ব কমল
এই বিধানসভায় জয়ী মহিলা বিধায়কের সংখ্যা ৩৭ জন, যা মোট সদস্যের মাত্র ১৩ শতাংশ।
২০২১ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪০। অর্থাৎ নারী প্রতিনিধিত্ব আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। রাজনৈতিক দলগুলির নারী সংরক্ষণ ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে জোরালো প্রচারের মধ্যেও বাস্তবে মহিলাদের উপস্থিতি কমে যাওয়া বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
কোটিপতি বিধায়কদের সংখ্যা বৃদ্ধি
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৭৮ জন বিধায়কের সম্পদের পরিমাণ এক কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ মোট বিধায়কের প্রায় ৬১ শতাংশ কোটিপতি।
২০২১ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৫৮ জন (৫৪ শতাংশ)। ফলে ধনী বিধায়কের হারও আগের তুলনায় বেড়েছে।
দলভিত্তিক কোটিপতি বিধায়ক
কোটিপতি বিধায়কের সংখ্যা বিজেপিতে আছে ১১৪ জন যা শতকরা হিসেবে 55% এবং তৃণমূলে ৫৯ জন, শতকরা হিসেবে ৭৪%।
এছাড়া—
২৭ জন বিধায়কের সম্পদ ১০ কোটি টাকার বেশি
৩২ জনের সম্পদ ৫ থেকে ১০ কোটির মধ্যে
সবচেয়ে ধনী ও দরিদ্র বিধায়ক
সবচেয়ে ধনী বিধায়ক হিসেবে উঠে এসেছে বিজেপির দিলীপ সাহা (Dilip Saha)-র নাম। মুর্শিদাবাদের নবগ্রাম কেন্দ্রের এই বিধায়কের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪৩ কোটি টাকা।
দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের জাভেদ খান (Javed Khan) — প্রায় ৩৯ কোটি টাকা সম্পদ নিয়ে।
তৃতীয় স্থানে আছেন তৃণমূল কংগ্রেসের বাইরন বিশ্বাস (Byron Biswas), যার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩৩ কোটি টাকা।
অন্যদিকে সবচেয়ে কম সম্পদের অধিকারী বিজেপির চিরণ বেরা (Chiran Bera)। তাঁর মোট সম্পদ মাত্র ১৭ হাজার টাকা।
এর পর রয়েছেন— কৌশিক চৌধুরী (Kaushik Chowdhury) — ৩১ হাজার টাকা
রেখা পাত্র (Rekha Patra) — ৯৬ হাজার টাকা
বার্ষিক আয়ে শীর্ষে কারা?
বার্ষিক আয়ের নিরিখে প্রথম স্থানে রয়েছেন বিজেপির শরদ্বত মুখোপাধ্যায় (Sharadwat Mukhopadhyay)। পেশায় চিকিৎসক এই বিধায়ক বছরে প্রায় ৪ কোটি টাকা আয়ের কথা জানিয়েছেন। তাঁর আয়ের প্রধান উৎস চিকিৎসা পেশা ও বেতন।
দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের ফিরহাদ হাকিম (Firhad Hakim) — প্রায় ১ কোটি ৭১ লক্ষ টাকা বার্ষিক আয়।
তৃতীয় স্থানে রয়েছেন পুলক রায় (Pulak Roy) — প্রায় ১ কোটি ১৮ লক্ষ টাকা আয় নিয়ে। ব্যবসা ও ব্যাংকের সুদ তাঁদের আয়ের উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষাগত যোগ্যতার চিত্র
প্রতিবেদন অনুযায়ী—
১৮৫ জন বিধায়কের শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক বা তার বেশি
৯২ জনের যোগ্যতা পঞ্চম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণির মধ্যে
৯ জন ডিপ্লোমাধারী
৫ জন শুধুমাত্র “লিটারেট” বা অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন
১ জন নিরক্ষর
তবে প্রতিবেদনে ওই বিধায়কদের নাম প্রকাশ করা হয়নি।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণ
বয়স হইতে বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে ২৫ থেকে ৪০ বছর বয়স্ক বিধায়কের সংখ্যা ৪৬ জন ৪১ থেকে ৬০ বছর বয়স কে বিধায়কের সংখ্যা ১৮৪ জন এবং ৬১ থেকে আসবি বছর বয়সে বিধায়কের সংখ্যা ৫৯ জন। আশি বছরের উর্ধ্বে তিনজন বিধায়ক আছেন। তবে সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে ৪১ থেকে ৬০ বছর বয়সে বিধায়কের সংখ্যা।
সবচেয়ে বেশি বিধায়ক মধ্যবয়সী শ্রেণিতে, অর্থাৎ ৪১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে।
রাজনৈতিক বার্তা কী?
এই প্রতিবেদন শুধুমাত্র সংখ্যার হিসাব নয়; এটি রাজ্যের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও প্রতিফলন।
একদিকে যেমন অপরাধমূলক মামলায় অভিযুক্ত প্রতিনিধির সংখ্যা বাড়ছে, তেমনই ক্রমশ ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বও বৃদ্ধি পাচ্ছে। নারী প্রতিনিধিত্বের হ্রাস এবং তুলনামূলকভাবে কম শিক্ষিত প্রার্থীদের উপস্থিতিও নতুন বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা দেখাচ্ছে যে নির্বাচনী রাজনীতিতে “জয়ের সম্ভাবনা” এখন অনেক ক্ষেত্রেই নৈতিকতা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বা পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
অন্যদিকে, সমর্থকদের দাবি—অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেও বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়, ফলে শুধুমাত্র মামলার ভিত্তিতে রাজনৈতিক মূল্যায়ন করা ঠিক নয়।
তবে সব বিতর্কের মাঝেও এই প্রতিবেদন একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিধানসভা শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার মানচিত্র নয়, বরং রাজ্যের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতারও একটি প্রতিচ্ছবি।





COMMENTS