বিশেষ প্রতিবেদন: এই দেশ
Supreme Court: SIR
এসআইআর নিয়ে সুপ্রিমকোর্টের বেনজীর রায়, নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য সরকারের মধ্যে বিরোধ মেটাতে বিচার বিভাগীয় অফিসার নিয়োগ করার নির্দেশ দিল
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বারবার নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য সরকারের মধ্যে বিরোধ গড়িয়েছে সুপ্রিমকোর্ট পর্যন্ত। ২০ ফেব্রুয়ারী এক ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে বিচারবিভাগীয় অফিসার নিয়োগের মাধ্যমে এই বিতর্কের নিস্পত্তি করতে চেয়েছে।
প্রত্যয় অনলাইন ডেস্ক:
সুপ্রিম কোর্ট আজ একটি অসাধারণ (extraordinary) নির্দেশ দিয়েছে যে,
পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর প্রক্রিয়ায় বিচার বিভাগীয় অফিসার (judicial officers) নিয়োগ করতে হবে। এই অফিসাররা 'logical discrepancy' বা 'তথ্যগত অসঙ্গতি' -র দাবিগুলো বিচার করবেন এবং ভোটার তালিকা সংশোধন করার দায়িত্ব নেবেন।
এই বিচার বিভাগের সিদ্ধান্তই হবে অন্তিম ও নিরপেক্ষ ভিত্তি, যাতে রাজ্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে 'trust deficit' বা বিশ্বাসের অভাব ঘুচে।
এমতাবস্থায়, সুপ্রিম কোর্ট কলকাতা হাইকোর্টকে নির্দেশ দিয়েছে serving ও former জজদের দায়িত্ব নিতে এবং এই দায়িত্ব শেষ না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়— এমন স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে।
প্রেক্ষাপট, এসআইআর কি এবং কেন বিতর্ক:
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সমীক্ষা বা (Special Intensive Revision) এসআইআর হলো ভোটার তালিকা (electoral roll) পুনরায় তৈরি করার একটি ব্যাপক ও কঠিন প্রক্রিয়া, যা আগামী বিধানসভা-সংশ্লিষ্ট নির্বাচনকে স্বচ্ছ ও নির্ভুল করতে তৈরি করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যে এই প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক জনমেছে, কারণ এখানে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে ২০০২ এর ভোটার তালিকার সঙ্গে ২০২৫ এর ভোটার তালিকার তথ্যগুলো 'logical discrepancy' (তথ্যগত অসঙ্গতি) হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। যদিও দেখা গেছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই AI generated কাজ হওয়ার ফলে এই বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে বলে অনেকে দাবি করছেন। ফলে অনেক ভোটারের নাম ভুলভাবে বাদ পড়েছে বা যাচাই সঠিকভাবে হচ্ছে না।
এসআইআর নিয়ে রাজ্য প্রশাসন, রাজ্য সরকার এবং নির্বাচন কমিশন অফ ইন্ডিয়া (ECI)-র মধ্যে তীব্র মতান্তর তৈরি হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টে দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রায় এসেছে।
শুরু থেকেই বিতর্কে এসআইআর প্রক্রিয়া:
পশ্চিমবঙ্গসহ ১৩টি রাজ্যে চলছে এসআইআর প্রক্রিয়া। বারবার সময় নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কাজের চাপে শতাধিক মৃত্যুর ঘটেছে। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে বারবার নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য সরকারের মধ্যে বিরোধ গড়িয়েছে সুপ্রিমকোর্ট পর্যন্ত। পশ্চিমবঙ্গের প্রধান বিরোধী দল বিজেপির দাবি প্রায় এক কোটি রোহিঙ্গার নাম ঢুকে পড়েছে ভোটার লিস্টে। যদিও তথ্য বলছে গোটা ভারতেই চল্লিশ হাজারের বেশী রোহিঙ্গার নেই। প্রথম অবস্থায় নির্বাচন কমিশন রাজ্যের জনগণকে আশ্বস্ত করে জানিয়ে ছিল কোন কাগজ লাগবে না এবং কোন বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়বে না ভোটার তালিকা থেকে। কিন্তু কাগজের পর দিতে হচ্ছে আর 'logical descripency' (তথ্যগত অসঙ্গতি) নাম করে লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। 'AI নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা ২০০২-এর তালিকায় থাকা ভোটারদের নামের একটা অংশ ভুল বানান টাইপ করেছে। আর এই ভুলের খেসারত দিতে হচ্ছে হেয়ারিং-এর নাম করে জনগণকে'-এমনটাই মনে করছেন এই কাজে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকা বিএলও (BLO) থেকে এইআরও (AERO).
সুপ্রীম কোর্টের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশের বিশ্লেষণ:
'Trust Deficit'— আদালতের উদ্বেগ
সুপ্রিম কোর্ট রায় ঘোষণা করার সময় জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং ECI-র মধ্যে বিশ্বাসহীনতা সৃষ্টি হয়েছে।
তীব্র অসন্তোষ এবং দোষারোপ চলছে, যা স্বচ্ছ ভোটার তালিকা প্রস্তুতির পথে বাধা সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতিতে শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়, বরং বিচার বিভাগীয় নজরদারি জরুরি। এটি একটি বিরল পরিস্থিতি যেখানে শীর্ষ আদালত নির্বাচন প্রক্রিয়া-সম্পর্কিত বিষয়গুলোতে সরাসরি হস্তক্ষেপের পথ খোলা রেখেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারির তালিকা চূড়ান্ত তালিকা নয়:
আদালত স্পষ্ট বলেছেন যে ২৮ ফেব্রুয়ারি যে তালিকা প্রকাশিত হবে সেই ভোটার তালিকাকে চূড়ান্ত ঘোষণা করা যাবে না যতক্ষণ না এই বিচার বিভাগের হস্তক্ষেপ দ্বারা সকল বিরোধমুক্ত করা হয়। অর্থাৎ, প্রথম প্রকাশিত তালিকাকে বিরোধমুক্ত ও স্থায়ী জনপ্রতিনিধিত্বের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হবে না।
প্রভাব ও প্রাসঙ্গিকতা:
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব
রাজ্য সরকার, ECI এবং আদালতের মধ্যে বিরোধ নিরসনে বিচার বিভাগীয় হস্তক্ষেপ একটি নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নীতি রচিত করেছে। ভোটার তালিকা-সম্পর্কিত বিরোধ প্রক্রিয়ায় বিচার বিভাগের অংশগ্রহণ প্রথমবারের মতো এই ধরনের নির্দেশে আরও ব্যাপক পরিমাণ ও সময় লেগে থাকলে, এর প্রভাব আগামী নির্বাচন পর্যন্ত থাকবে।
আইনি নীতি ও নির্বাচন স্বচ্ছতা:
এই রায়টি একটি আইনি নজির তৈরি করেছে যেখানে একটি ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া-তে বিচার বিভাগের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্বাচন-সম্পর্কিত বিরোধকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং বিচারযোগ্য পর্যায়ে পাওয়া সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে।
২০ ফেব্রুয়ারী সুপ্রিম কোর্টের রায়টি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি ঐতিহাসিক নির্দেশ, যা, নির্বাচনী স্বচ্ছতার জন্য বিচার বিভাগের নিরপেক্ষ নজরদারি নিশ্চিত করে, রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় প্রতিপক্ষদের মধ্যে বিশ্বাসের অভাব দূর করার পথে নতুন দিক নির্দেশ করে, এবং ভোটার তালিকা-সম্পর্কিত বিরোধ নিবারণের জন্য আইনি মানদণ্ডকে স্ট্যান্ডার্ড করে তোলে। এই রায় ভবিষ্যতে নির্বাচন-সম্পর্কিত আইনি প্রক্রিয়াগুলোর ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে এবং প্রমাণ করবে যে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বিচার বিভাগের ন্যায়পরায়ণ ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

COMMENTS