রম্যরচনা: পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ: গদি মিডিয়ার বদলে যাওয়া দৃষ্টি রাকিবুল ইসলাম দেশের তথাকথিত মূলধারার মিডিয়া অনেকে বলে থাকেন ‘গদি’ মিডিয়...
রম্যরচনা:
পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ: গদি মিডিয়ার বদলে যাওয়া দৃষ্টি
রাকিবুল ইসলাম
দেশের তথাকথিত মূলধারার মিডিয়া অনেকে বলে থাকেন ‘গদি’ মিডিয়া। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি যে খুব স্থির নয়, তা নতুন করে বলার কিছু নেই। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাদের দৃষ্টি সরে যাওয়ার গতি চোখে পড়ার মতো। বহু বছর ধরে পাকিস্তান ছিল সেই চিরপরিচিত ফোকাস—যাকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন আশঙ্কা, আতঙ্ক ও জাতীয়তাবাদের নাটক সাজানো হতো। এখন সেই জায়গা অনেকটাই দখল করেছে বাংলাদেশ।
এক সময় স্টুডিওর পর্দায় ঘুরে ফিরে দেখা যেত ইসলামাবাদ, লাহোর বা করাচির দৃশ্য। আজ সেখানে ঢাকার রাজপথ, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবৃতি, এমনকি সামাজিক মাধ্যমের বিচ্ছিন্ন পোস্টও বিশ্লেষণের কেন্দ্রে। প্রশ্ন তোলা হচ্ছে—বাংলাদেশে কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে এবং তা ভারতের জন্য কতটা ‘চিন্তার’।
এই প্রশ্ন তোলার ভঙ্গিটাই আসলে লক্ষ্য করার মতো। প্রতিবেশী একটি সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনাবলি এমনভাবে পরিবেশিত হচ্ছে, যেন তা সরাসরি দিল্লির নীতিনির্ধারণের অংশ। কখনও রাজনৈতিক টানাপোড়েন, কখনও জনআন্দোলন, কখনও কূটনৈতিক বক্তব্য—সবই ভেঙে পড়ছে স্টুডিওর আলোচনার টেবিলে, প্রায়শই অতিরঞ্জনের মোড়কে। পরিস্থিতির বাস্তবতা যাই হোক না কেন সমালোচনার এত তেজ তাতে আইপিএল থেকে সরিয়ে দিতে হয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেটার মোস্তাফিজুরের নাম। তবে ভাববেনা জয়া আহসান বা নুসরত ফারিয়া কিন্তু ব্রাত্য নয়।
আরও আশ্চর্যের বিষয়, পাকিস্তান-বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত বহু বিশ্লেষক রাতারাতি বাংলাদেশ-বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছেন। ভৌগোলিক সীমারেখা বদলালেও মন্তব্যের ধরন বদলায়নি। একই সন্দেহ, একই শঙ্কা, একই ‘অদৃশ্য হুমকি’র ভাষা—শুধু দেশের নাম পাল্টে গেছে।
আসলে প্রশ্ন বাংলাদেশকে নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো গদি মিডিয়ার প্রয়োজন নিয়ে। তাদের সব সময় একটি ‘উদ্বেগের কেন্দ্র’ দরকার—যাকে দেখিয়ে অভ্যন্তরীণ সরকারের ব্যর্থতা, প্রশ্ন ও জবাবদিহির বিষয়গুলো আড়াল করা যায়। দীর্ঘদিন দেশের সরকার ব্যর্থতা আড়াল করে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় তুলে ধরে দৃষ্টি ঘুরিয়েছে অতি আগ্রহী সরকারের লবণ ভক্ষক 'গদি' মিডিয়া। এখন পরিস্থিতির চাপে বা ক্লান্তিতে সে জায়গা পূরণ করছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের পটপরিবর্তন সেই সুযোগ সুলভ করেছে। অনেকটা একঘেয়েমিও দূর হয়েছে।
এই প্রবণতা কেবল মিডিয়ার দায়িত্বজ্ঞানহীনতাই নয়, পাঠক-দর্শকের বুদ্ধিবৃত্তিক অবমূল্যায়নও বটে। প্রতিবেশী দেশের ঘটনাকে তথ্য ও প্রেক্ষাপটসহ উপস্থাপন না করে, তাকে আতঙ্কের গল্পে রূপ দেওয়া সাংবাদিকতার কাজ হতে পারে না।
মানচিত্রে দৃষ্টি বদলালেও গদি মিডিয়ার অভ্যাস বদলায়নি। প্রতিবেশী দেশের বিষয়ে এত ব্যস্ত যে দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে প্রশ্ন তুলতে বেমালুম ভুলে গেছে।
সংবাদ মাধ্যমের কাজ হল সত্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরা। কিন্তু সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সূচকের তলানিতে থাকা গণমাধ্যম থেকে এর থেকে হয়তো বেশি আশাকরা অপরাধ।

COMMENTS