সম্পাদকীয়:
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস
বহুভাষীর দেশে বাংলাভাষীরা সংকটে
ভারতের ঐতিহ্য বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য। নানা ভাষা নানা মতের এই ভারতের এই ঐতিহ্য বিভিন্ন। চারিদিকে একটা হতাশায় ছবি প্রকট হচ্ছে। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর নির্যাতন করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের এই দু-মাসের মধ্যে প্রায় ১২ জন বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিককে হত্যা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে সকলের দাবি হোক এই সংকট নিরসনের।
ভারত বহুভাষা ও বহুসংস্কৃতির এক অনন্য ভূখণ্ড। সংবিধান স্বীকৃত ২২টি তফসিলভুক্ত ভাষা এবং শতাধিক আঞ্চলিক ভাষার সহাবস্থানে গড়ে উঠেছে এই দেশ। এই বহুত্ববাদী চেতনাই ভারতের শক্তি। কিন্তু ভাষা দিবসের প্রাক্কালে প্রশ্ন জাগে—এই বহুভাষিক ভারতের বুকে কি সব ভাষাভাষী মানুষ সমান মর্যাদা ও নিরাপত্তা পাচ্ছেন? বিশেষত বিভিন্ন রাজ্যে বসবাসরত বাঙালিরা কি ভাষা ও সংস্কৃতিগত কারণে সংকটে পড়ছেন না?
২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস—যার শিকড় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে মাতৃভাষার অধিকারের দাবিতে শহিদদের আত্মত্যাগের ইতিহাসে। আজকের বাংলাদেশে সেই আন্দোলনের স্মৃতি অম্লান, আর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দিবসটি স্বীকৃতি পেয়েছে UNESCO-এর উদ্যোগে। ভাষার মর্যাদা ও বহুত্ব রক্ষার এই বার্তা কেবল একটি দেশের নয়, সমগ্র বিশ্বের।
তবু বাস্তবের চিত্র সবসময় আশাব্যঞ্জক নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মহারাষ্ট্র, গুজরাট, অসম, কর্ণাটক কিংবা রাজধানী দিল্লি-সহ নানা অঞ্চলে কাজের সূত্রে বসবাসকারী বাঙালিদের উপর সামাজিক বৈষম্য, ভাষাগত বিদ্বেষ, হেনস্তা এমনকি হত্যার মতো অভিযোগ সামনে এসেছে। কোথাও কর্মক্ষেত্রে স্থানীয় ভাষা না জানার কারণে বঞ্চনা, কোথাও রাজনৈতিক উত্তেজনার আবহে ‘বহিরাগত’ তকমা—এসব অভিজ্ঞতা বহু বাঙালির দৈনন্দিন বাস্তবতা হয়ে উঠছে।
বিশেষত উত্তর-পূর্ব ভারতে নাগরিকত্ব ও পরিচয় রাজনীতির টানাপোড়েনে বাঙালিরা বহুবার সন্দেহ ও অবিশ্বাসের শিকার হয়েছেন। ইতিহাস সাক্ষী, ভাষা ও জাতিগত পরিচয়ের প্রশ্নে সংঘাত নতুন নয়। তবে যে দেশ তার সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও বহুত্ববাদকে ধারণ করে, সেখানে ভাষার ভিত্তিতে বিদ্বেষ অগ্রহণযোগ্য।
ভারতের সংবিধান ভাষাগত সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষিত করেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ, সাংস্কৃতিক চর্চার স্বাধীনতা এবং বৈষম্যবিরোধী নীতি—এসব কাগজে-কলমে স্পষ্ট। কিন্তু বাস্তবায়নের ঘাটতি থেকেই সমস্যার সূত্রপাত। যখন আঞ্চলিকতাবাদ রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন বহুভাষিক সহাবস্থান দুর্বল হয়।
বাঙালিরা কেবল একটি ভাষাগোষ্ঠী নয়; তারা ভারতীয় সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে সুভাষচন্দ্র বসু—জাতীয় পরিসরে বাঙালির ভূমিকা অনস্বীকার্য। সুতরাং কোনো রাজ্যে বাঙালির উপর ভাষাগত বা আঞ্চলিক বিদ্বেষ কেবল একটি সম্প্রদায়ের প্রতি অন্যায় নয়, ভারতের বহুত্ববাদী চেতনার প্রতিই আঘাত।
ভাষা দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—মাতৃভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। বহুভাষার সহাবস্থানই ভারতের ঐক্যের শক্তি। তাই প্রয়োজন সংবেদনশীল প্রশাসন, দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ভাষ্য এবং সর্বোপরি নাগরিক সমাজের সক্রিয় ভূমিকা, যাতে ভাষার ভিন্নতা বিভেদের কারণ না হয়ে বৈচিত্র্যের গৌরব হয়ে ওঠে।
ভারত যদি সত্যিই 'একতা মে বৈচিত্র্য'-র আদর্শে বিশ্বাসী হয়, তবে প্রতিটি ভাষাভাষী মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই হবে ভাষা দিবসের প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি। বহুভাষীর দেশ তখনই সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী হবে, যখন কোনো বাঙালি—বা অন্য কোনো ভাষাভাষী—নিজের মাতৃভাষার কারণে নিজভূমে পরবাসী বোধ করবেন না।

COMMENTS