ধর্ম ও জীবন আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) একজন সফল ব্যবসায়ী এবং দ্বীনের কাজে অগ্রণী সাহাবী রাকিবুল ইসলাম নবী হজরত মুহাম্মদ (সঃ) নবুয়তের পর ...
ধর্ম ও জীবন
আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) একজন সফল ব্যবসায়ী এবং দ্বীনের কাজে অগ্রণী সাহাবী
রাকিবুল ইসলাম
নবী হজরত মুহাম্মদ (সঃ) নবুয়তের পর পরই যে কয়েকজন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ)। তিনি ব্যবসা এবং দ্বীনের প্রচারের কাজের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার অনন্য নজির রেখেছিলেন। তিনি যখন মক্কা ছেড়ে মদীনায় হিজরত করেন তখন মদিনার ধনাঢ্য ব্যক্তি সাদ ইবনে রাবি আল খাজরাজীর গৃহে আশ্রয় পান। সা'দ (রাঃ) আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ)-কে প্রস্তাব দেন তার সম্পদের অর্ধেক নেয়ার জন্য। উত্তরে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) বলেন, "আল্লাহ আপনার পরিজনদের মধ্যে বরকত কল্যাণ দান করুন। ভাই, এসব কোনো কিছুরই প্রয়োজন নেই। আমার আমাকে শুধু বাজারের পথটা দেখিয়ে দিন।" ইসলামের ইতিহাসে যেমন হযরত সাদ (রাঃ) এর দৃঢ় আস্থা এবং অতুলনীয় উদারতার দৃষ্টান্ত স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে, তেমনি হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) আত্মনির্ভরতা ও নিজ পায়ে দাঁড়ানো দৃঢ় সংকল্প ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের একটা প্রেরণা যুগিয়ে চলেছে।
আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ)-এর জাহিলি যুগে নাম ছিল আবদু আমর। তার ইসলাম গ্রহণের পর রাসুল (সাঃ) তার নাম বদলে রাখেন আব্দুর রহমান তিনি মক্কার 'যুহরা' গোত্রের লোক ছিলেন।
![]() |
| আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) কবর |
তখন ইসলামের প্রাথমিক যুগ। মক্কার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা প্রায় প্রতিদিনই হযরত আবু বকরের (রাঃ) বাড়িতে বৈঠকে মিলিত হতেন। আব্দুর রহমান ইবনে আফফ (রাঃ) সেই বৈঠকে নিয়মিত যেতেন। তিনি হযরত আবু বক্কর (রাঃ)-এর খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। আবু বকর (রাঃ) দাওয়াতেই তিনি ইসলামের প্রথম পর্বে নবী মুহাম্মদ (সঃ) সাথী হয়ে যান।
আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) ছিলেন 'সাহাবুল হিজরাতাইন' অর্থাৎ তিনি এমন একজন সাহাবী ছিলেন যিনি ইসলামের প্রাথমিক যুগে দুটি স্থানে হিজরত করেন। নবুয়তের পঞ্চম বছরে জাফর ইবনে আবি তালিব নেতৃত্বে যে দলটি আবিসিনিয়া হিজরত করে তিনি সেই দলে ছিলেন। আবার নবী মুহাম্মদ (সঃ)-এর মদিনায় হিজরতের পর তিনি মক্কায় তার সবকিছু ছেড়ে মদিনায় হিজরত করেন।
হজরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) একজন ভালো যোদ্ধা ছিলেন। তিনি বদর, উহুদ ও খন্দক সহ বেশিরভাগ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। যুদ্ধক্ষেত্র অসিম সাহসীকতার পরিচয় দেন। উহুদ যুদ্ধে তিনি গোটা শরীরে প্রায় একত্রিশটা আঘাত পান। ষষ্ঠ হিজরীর সাবান মাসে নবী মুহাম্মদ (সঃ) মদিনা থেকে তিনশো মাইল উত্তরে 'দুমাতুল জান্দালে' একটা অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। আর এই বাহিনীর পরিচালনার দায়িত্ব দেন আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) উপর। মক্কা বিজয়ের সময় মুহাজিরদের যে ছোট্ট দলটায় রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ছিলেন সেই দলটিতে ছিলেন এই সাহাবী আব্দুর রহমান।
নবম হিজরীতে তাবুক অভিযানের সময় নবীজী যখন মুসলিমদের অর্থনৈতিক কাছে সাহায্যের আবেদন করলেন তখন আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) এত পরিমাণ অর্থ দান করলেন যে চারিদিকে একটা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। মুনাফেকরা বলতে থাকে, 'সে একজন রিয়াকার, লোক দেখানোই তার উদ্দেশ্য'। অন্য একটি বর্ণনায় আছে, হজরত উমর (রাঃ) তাঁর এই দান দেখে বলে ফেললেন, 'আমার মনে হয় আব্দুর রহমান গোনাহগার হয়ে যাচ্ছে। কারণ সে তার পরিবারের জন্যে কিছুই রাখেনি।' একথা শুনে রাসূল (সাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেন, 'আব্দুর রহমান, পরিবারের জন্য কিছু রেখে কী?' উত্তরে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) বলেন, 'হ্যাঁ, আমি যা দান করেছি তার থেকে উৎকৃষ্ট জিনিস তাদের জন্য রেখেছি।' নবী মুহাম্মদ (সঃ) জানতে চাইলেন, 'কতটা?' তিনি বলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যে রিযিক, কল্যাণ ও প্রতিদানের অঙ্গীকার করেছেন, তাই।'
তাবুক অভিযানের সময় ফজরের নামাজে নবীজীর উপস্থিত হতে দেরী হওয়ায় সম্মিলিত সাহাবীদের অনুরোধে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) ফজরের নামাজের ইমামতি করেন। এক রাকাত হওয়ার রাসূলুল্লাহ উপস্থিতি বুঝতে পেরে ইমামতি সরে আসতে চাইলে নবীজী (সঃ) তাকে নামাজ শেষ করার জন্য ইশারা করেন।
খলিফা হযরত উমর (রাঃ) সময়। ফজরের নামাজরত অবস্থায় ছুরিকাবিদ্ধ হলেন খলিফা উমর (রঃ) তিনি আহত অবস্থায় কাছে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে থাকা আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) নামাজের ইমতিতে দাঁড় করিয়ে দেন।
খলিফা হযরত উমরের (রাঃ) মৃত্যুর পূর্বে পরবর্তী খলিফা নির্বাচনের যে দায়িত্ব তার উপর অর্পণ করেন তিনি তা নিষ্ঠা ও আমানতদারীর সথে অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। পরবর্তীতে অন্যান্য খলিফারাও তার যোগ্যতার যোগ্য সম্মান দেন।
আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) যখন মক্কা ছেড়ে মদীনায় এসেছিলেন তিনি ছিলেন একেবারে রিক্ত হাতে, তার সমস্ত সম্পদ মক্কায় রেখে আসেন। মদিনা এসে তিনি সামান্য ঘি ও পনির কেনাবেচার মাধ্যমে তার ব্যবসা শুরু করেন। কাল ক্রমে তিনি মুসলিম উম্মার একজন সেরা ব্যবসায়ী ধনাঢ্য ব্যক্তিতে পরিণত হন। কিন্তু সে সম্পদের প্রতি তার এতোটুকু লোভ ও আকর্ষণ সৃষ্টি হয়নি। সে সম্পদ তিনি অকৃপাল হাতে আল্লাহর পথে মানব কল্যাণে ব্যয় করেছেন। যখনই ইসলামের প্রয়োজনে অর্থের দরকার হয়েছে তখনই তিনি সবার আগে উপস্থিত হয়েছেন তার সাধ্যমত অর্থ নিয়ে।
বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায় আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) প্রায় 30 হাজার দাস মুক্ত করেন। তিনি ওই ব্যক্তিদের একজন ছিলেন যিনি জাহিলি যুগেও মদ পান কে হারাম বলে মনে করতেন।
একবার ইফতারের পর তার সামনে উপস্থিত খাবারের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, "মুসইয়াব ইবনে উমাইর ছিলেন আমাদের থেকেও উত্তম মানুষ। তিনি শহীদ হলে তার জন্য মাত্র ছোট্ট একখানা কাফনের কাপড় পাওয়া গিয়েছিল তা দিয়ে মাথা ঢাকলে পা এবং পা ঢাকলে মাথা বেরিয়ে যাচ্ছিল। তারপর আমাদের জন্য দুনিয়ার প্রাচুর্য দান করলেন। আমার ভয় হয় না জানি আমাদের বদলা দুনিয়াতে দিয়ে দেয়া হয়।" অতঃপর তিনি হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন।
হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) একদিকে ইসলামের প্রচার প্রসার এবং চিন্তা চেতনাকে দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োগ করেছেন। অন্যদিকে একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। তিনি দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত ত্যাগের পরিচয় দিয়েছেন। কখনো তিনি নিজের পেশাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজ থেকে বিরত থাকেননি। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাহাবীদের মধ্যে অন্যতম সাহাবী আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) তার জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে আমাদের কাছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।
তথ্যসূত্র: আসহাবে রাসূলের জীবনকথা
.jpeg)
.jpeg)
COMMENTS