সম্পাদকীয়:
৭৯তম স্বাধীনতা দিবসের প্রেক্ষিতে
স্বাধীনতার প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি
ভারত স্বাধীন হয়েছে যে লক্ষ্য নিয়ে আজ স্বাধীনতার ৭৯তম বছরে তার অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। দেশ দূর্নীতি, অবিচার-অনাচারে, সাম্প্রদায়িক হানাহানি এবং শাসক সম্প্রদায়ের রাজা সুলভ নীতিতে জর্জরিত। সবচেয়ে বড় বিপর্যয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ গণমাধ্যমের বড় অংশ শাসকের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে। অবশ্যই এই পরিস্থিতির পরিবর্তন জরুরি।
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের সূর্যোদয় ছিল ভারতীয় ইতিহাসের এক যুগান্তকারী মুহূর্ত। দু'শো বছরেরও বেশি সময়ের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির আনন্দে দেশ মাতোয়ারা হয়ে উঠেছিল। স্বাধীনতার প্রথম প্রভাতে মানুষের চোখে ছিল নতুন ভোরের স্বপ্ন—সামাজিক ন্যায়, দারিদ্র্যমুক্তি, সবার জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন। স্বাধীনতার সংজ্ঞা তখন কেবল রাজনৈতিক মুক্তি নয়; ছিল আত্মমর্যাদার পুনর্দখল, ছিল ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের অঙ্গীকার।
কিন্তু দেশের স্বাধীনতার ৭৯ বছর পর প্রশ্ন জাগে—আমরা সেই প্রত্যাশার কতটুকু পূরণ করতে পেরেছি? অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হলেও আয়ের বৈষম্য বেড়েছে বহুগুণে। গ্রামীণ দারিদ্র্য, বেকারত্ব, কৃষকের আত্মহত্যা আজও শিরোনাম হয়। স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা ও মান উন্নত হলেও, তা এখনও অধিকাংশ মানুষের নাগালের বাইরে। শিক্ষায় অগ্রগতি হলেও গুণগত মান, শিক্ষার সমান সুযোগ—এখানেও এখনও বৈষম্যের প্রাচীর বিদ্যমান।
সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে। স্বাধীনতার চেতনা ছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, এবং নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা। অথচ আজ সেই অধিকারগুলো অনেক ক্ষেত্রেই প্রশ্নবিদ্ধ। সরকারবিরোধী মতকে দেশদ্রোহিতা বলে চিহ্নিত করার প্রবণতা, গণমাধ্যমের ওপর চাপ, ভিন্নমত দমনের কৌশল—সবই স্বাধীনতার চেতনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে নিরাপত্তাহীনতার নতুন মাত্রা—SIR-এর হুমকি। স্বাধীনতার এত বছর পরও দেশের জনগণ আবারও প্রশ্নের মুখে—নাগরিক অধিকার কি সত্যিই সুরক্ষিত? “SIR” বা Special Intensive Revision-এর নামে বিশেষ সম্প্রদায় ও অঞ্চলের মানুষকে বারবার যাচাই, কাগজপত্রের জটিলতা এবং অযৌক্তিক জেরায় ফেলে হয়রানি করা হচ্ছে।
স্বাধীন দেশে প্রশাসন হওয়ার কথা সেবা ও ন্যায়ের প্রতীক, ভয় ও বৈষম্যের নয়। ইতিহাসে যেমন ঔপনিবেশিক শাসকেরা প্রশাসনিক শক্তিকে দমননীতির হাতিয়ার বানিয়েছিল, আজ তার পুনরাবৃত্তি স্বাধীন দেশে মেনে নেওয়া যায় না।
যদি সত্যিই SIR জনস্বার্থে হয়, তবে তা হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায়সঙ্গত ও বৈষম্যহীন। অন্যথায় এটি স্বাধীনতার চেতনাকে কলঙ্কিত করবে। জনগণের ঐক্য ও জবাবদিহির দাবি ছাড়া এই অবস্থা বদলানো সম্ভব নয়।
তবুও হতাশ হওয়ার কারণ নেই। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—এ দেশের মানুষ প্রতিকূলতার মাঝেই নতুন পথ খুঁজে নিতে জানে। স্বাধীনতার প্রকৃত সার্থকতা হবে তখনই, যখন আমরা প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির ফাঁক কমিয়ে আনতে পারব—যেখানে উন্নতি কেবল কাগজের পরিসংখ্যান নয়, বরং মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়ে উঠবে।
৭৯তম স্বাধীনতা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি, সমতা ও ন্যায়ের চেতনা, এবং নাগরিক স্বাধীনতাকে নতুন করে সংরক্ষণ করার। স্বাধীনতার প্রকৃত জয়গান হবে তখনই, যখন প্রতিটি ভারতীয় নিঃশঙ্ক চিত্তে বলতে পারবে—আমি স্বাধীন, এবং আমার স্বাধীনতা নিরাপদ।


COMMENTS