সম্পাদকীয়:
উচ্চ শিক্ষার অঙ্গনেও ভয়ঙ্কর ঘৃণার চাষ!
বিষাক্ত হয়ে উঠেছে বাংলার বাতাস
দিল্লির লালকেল্লার কাছে ভয়াবহ গাড়িবোমা বিস্ফোরণের পরদিনই কলকাতার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের (ISI) ছেলেদের হোস্টেলের দরজায় লেখা হলো — “No dogs and Muslims.”
এই চারটি শব্দ শুধু দেয়ালের রং নষ্ট করেনি, নষ্ট করেছে এক শিক্ষাঙ্গনের আত্মাকে।
আইএসআই — যে প্রতিষ্ঠানকে ভারতীয় বিজ্ঞান, গণিত ও পরিসংখ্যান গবেষণার ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ বলে গণ্য করা হয়, যেখানে প্রসান্তচন্দ্র মহলানবীশের উত্তরাধিকার আজও সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করা হয় — সেই প্রতিষ্ঠানের হোস্টেল প্রাচীরে এমন ঘৃণাত্মক বার্তা লেখা হওয়া নিঃসন্দেহে এক ভয়ঙ্কর সংকেত।
শুধুমাত্র একটা ঘটনা নয়, চেপে রাখা ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ:
এই ঘটনার সঙ্গে কে বা কারা যুক্ত, তা জানা বা শাস্তি দেওয়ার অবশ্যই প্রয়োজন আছে। কিন্তু তার থেকেও বড় প্রশ্ন হলো — এমন মানসিকতা আদৌ কীভাবে তৈরি হলো?
কীভাবে এমন এক শিক্ষাঙ্গনে, যেখানে ছাত্ররা দেশের সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত ও যুক্তিবাদী তরুণ হিসেবে গড়ে ওঠেন, সেখানে ধর্মবিরোধী এই মনোভাব ঢুকে পড়ল?
উত্তর খুঁজলে দেখা যাবে — এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
গত কয়েক বছরে ভারতজুড়ে যে হারে ধর্মীয় মেরুকরণ, ঘৃণার রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক বিভাজন বৃদ্ধি পেয়েছে, তারই প্রতিধ্বনি এটি।
মিডিয়া, রাজনীতি এবং সামাজিক মাধ্যমে যখন মুসলমান পরিচয়টিকে সন্দেহের চোখে দেখানো হচ্ছে, তখন তরুণ প্রজন্মের একাংশও অচেতনভাবে সেই ঘৃণার ভাষা আত্মস্থ করছে।
প্রশাসনের নীরব ভূমিকা আরও ভয়ংকর:
Alt News–এর প্রতিবেদন বলছে, আইএসআই প্রশাসন প্রথমে সিসিটিভি ফুটেজ দেখাতে অস্বীকার করেছে, এবং ঘটনাটি ‘মুছে ফেলার’ কথাও তুলেছে।
এই মানসিকতা, “চলুক না, চেপে যাক”—এই প্রবণতাই আজকের সর্বাধিক বিপজ্জনক রূপ।
কারণ ঘৃণাকে চেপে রাখলে তা শেষ হয় না, বরং তা ভিতরে ভিতরে আরও শক্ত হয়।
একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের কর্তব্য শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া নয় — এমন মনোভাবের পেছনে যে অজ্ঞতা, অবিশ্বাস ও প্রচারনির্ভর ঘৃণা কাজ করছে, সেটিকে ভেঙে দেওয়া।
যে “সচেতনতা কর্মসূচি” বা “সেমিনার”-এর কথা প্রশাসন বলেছে, তা যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতা না হয়ে ওঠে — বরং তার ভিতর থেকে আত্মসমালোচনা বেরিয়ে আসে, সেটাই প্রয়োজন।
শিক্ষাঙ্গন মানেই প্রশ্ন করার স্থান
আইএসআইয়ের ছাত্ররা, বিশেষত মুসলিম শিক্ষার্থীরা, বলেছে যে এতদিন তারা কোনও ধর্মীয় বৈষম্যের মুখোমুখি হননি।
এটি যেমন আশার কথা, তেমনি সতর্কবার্তাও।
ঘৃণার বীজ একবার বোনা হয়ে গেলে তা নীরবতায়ও বাড়তে থাকে।
তাই ছাত্রসমাজের নিজেদের ভেতরেই প্রশ্ন জাগাতে হবে — আমরা কেমন সমাজে বাস করতে চাই?
আমরা কি বিজ্ঞানচর্চার নামে অন্ধ বিশ্বাসে ফিরে যাব, নাকি যুক্তিবাদের শক্তিতে এই অন্ধকারকে প্রতিরোধ করব?
প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও নৈতিক দায়
ঘটনাটি এমন সময় ঘটেছে যখন আইএসআই বিল নিয়ে বিতর্ক চলছে — অনেকেই মনে করছেন, নতুন বিলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক স্বাধীনতা খর্ব করা হবে।
স্বাধীনতা কেবল প্রশাসনিক কাঠামোয় নয়, চিন্তা ও মতপ্রকাশের ক্ষেত্রেও জরুরি।
যেখানে চিন্তা দমন করা হয়, সেখানে ঘৃণা ও ভয় দ্রুত শেকড় গাঁথে।
তাই এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে আইএসআই–এর স্বাধীনতা রক্ষার আন্দোলন আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে — কারণ স্বাধীন চিন্তাই গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি।
“মুসলমান ও কুকুর নিষিদ্ধ” — এই বাক্য কেবল এক সম্প্রদায়কে অপমান নয়, এটি আমাদের সমষ্টিগত মানবতাকেও আঘাত করে।
যে জাতি তার মেধার শ্রেষ্ঠ আসনেও ঘৃণার বীজ রোপণ করে, সে জাতি নিজেই তার ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে।
কারণ, যুক্তি ও মানবতার জয় না হলে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দেয়ালগুলো একদিন শুধু স্লোগানে নয়, নীরবতায়ও ভরে উঠবে।



COMMENTS