মতামত : SIR বিতর্ক: ভোটাধিকার হরণের প্রক্রিয়া? ২০০২ সালের তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও বহু মুসলিম ভোটারকে হেয়ারিংয়ে ডাকা এবং প্রকাশিত তাল...
মতামত:
SIR বিতর্ক: ভোটাধিকার হরণের প্রক্রিয়া?
২০০২ সালের তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও বহু মুসলিম ভোটারকে হেয়ারিংয়ে ডাকা এবং প্রকাশিত তালিকায় 'আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন' রাখা হয়েছে—নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে উঠছে গুরুতর প্রশ্ন।
ইমরান মোল্যা, শিক্ষক
আমি একজন নাগরিক হিসেবে, একজন শিক্ষক হিসেবে এবং একজন সংখ্যালঘু মুসলমান হিসেবে সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গের SIR (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়াকে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি। গণতন্ত্রে ভোটাধিকার শুধু একটি প্রশাসনিক সুবিধা নয়—এটি নাগরিক সত্তার মৌলিক স্বীকৃতি। অথচ আজ দেখা যাচ্ছে, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও বহু মুসলমান নাগরিককে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’র অজুহাতে হেয়ারিং-এ ডেকে হেনস্থা করা হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—এই হেয়ারিং প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে নয়, বরং বেছে বেছে মুসলিম অধ্যুষিত বুথগুলোকেই টার্গেট করে পরিচালিত হচ্ছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন একটি চলমান প্রশাসনিক প্রক্রিয়া—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে? নামের বানানভেদ, ঠিকানার ক্ষুদ্র পরিবর্তন, পিতার নামের সংক্ষিপ্ততা—এসব সমস্যা বহু বছর ধরে সকল সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেই ছিল এবং সাধারণত নোটিস বা কাগজপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে সমাধান হয়েছে। এখন দেখা যাচ্ছে, একই ধরনের ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও অমুসলিম বুথে হেয়ারিং তুলনামূলক কম, আর মুসলিম বুথে বেশি। এই অসম প্রয়োগই সন্দেহের জন্ম দেয়।
২০০২-এর তালিকা থাকা সত্ত্বেও সন্দেহের চোখে
যাঁদের নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় ছিল, তাঁরা অন্তত দুই দশক ধরে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে আসছেন। হঠাৎ করে তাঁদের নাগরিকত্ব বা ভোটার হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা প্রশাসনিক অসতর্কতা নয়—এটি আস্থার সংকট তৈরি করে। একজন নাগরিক যখন বছরের পর বছর রাষ্ট্রের কাছে স্বীকৃত থেকেও হঠাৎ ‘প্রমাণ দাও’ পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, তখন সেটি মানসিক নিপীড়নে পরিণত হয়।
আমি ইচ্ছাকৃতভাবে ইতিহাসের তুলনা টানছি—কারণ ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে। নাৎসি জার্মানিতে প্রথমে ইহুদিদের নাগরিকত্ব প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছিল কাগজপত্র, তালিকা ও শ্রেণিবিভাগের মাধ্যমে। অবশ্যই, আজকের ভারত নাৎসি জার্মানি নয়—এ কথা আমি পরিষ্কারভাবে বলছি। কিন্তু সংখ্যালঘুদের আলাদা করে শনাক্ত করা, বেছে বেছে প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করা—এই পদ্ধতিগত বৈষম্য ইতিহাসে কখনোই শুভ ফল দেয়নি। তুলনাটি ভয়ের জন্য নয়, সতর্কতার জন্য।
গণতন্ত্র বনাম প্রশাসনিক ক্ষমতা
গণতন্ত্রে প্রশাসনের কাজ নাগরিককে সুরক্ষা দেওয়া, সন্দেহভাজন বানানো নয়। যদি সত্যিই তালিকা সংশোধনের প্রয়োজন থাকে, তবে তা হতে হবে সর্বজনীন, স্বচ্ছ ও সমানভাবে প্রয়োগযোগ্য। মুসলিম বুথ মানেই বেশি হেয়ারিং—এই ধারণা রাষ্ট্র নিজেই তৈরি করছে, যা সামাজিক বিভাজনকে আরও গভীর করে।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলা কথা
আমি শিক্ষকতার পেশায় যুক্ত। আমি জানি, ছাত্রদের সামনে ন্যায়বিচার আর সমতার কথা বলি। কিন্তু যখন দেখি, আমারই সমাজের মানুষ—যাঁরা দরিদ্র, কম শিক্ষিত—তাঁদের কাগজপত্রের অজুহাতে অফিসে অফিসে ঘুরতে হচ্ছে, অপমান সহ্য করতে হচ্ছে, তখন বিবেক প্রশ্ন তোলে। রাষ্ট্র কি তার দুর্বল নাগরিকদের পাশে দাঁড়াবে না?
SIR প্রক্রিয়া বাতিল করা নয়—ন্যায়সঙ্গত করা জরুরি। ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ যেন নির্বাচনী হাতিয়ার না হয়। সংখ্যালঘুদের টার্গেট করে হেয়ারিং গণতন্ত্রকে দুর্বল করে, রাষ্ট্রের ওপর মানুষের আস্থা ভাঙে। আজ যদি আমরা প্রশ্ন না তুলি, কাল হয়তো ভোটাধিকারই প্রশ্নের মুখে পড়বে। একজন নাগরিক হিসেবে আমি চাই—সমান চোখে দেখা হোক, সমান নিয়মে বিচার হোক, আর গণতন্ত্র কাগজে নয়, বাস্তবে বাঁচুক।

COMMENTS