সম্পাদকীয়:
দুর্নীতি দমনের আড়ালে কেন্দ্রের কর্তৃত্ববাদ
প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীদের দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার হলেই পদচ্যুতি—এমন বিল আনা হচ্ছে সংসদে। প্রথম দেখায় স্বচ্ছতার পোশাকে ঢাকা এই প্রস্তাব আসলে ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা। জনগণের ভোটের মর্যাদা কেড়ে নিয়ে ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করার এই চক্রান্ত যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দূর করতে হবে।
সংবিধান পরিষ্কার বলেছে—প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রীকে সরানোর একমাত্র পথ হলো আস্থা ভোট। জনগণের ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে কোনও প্রশাসনিক সংস্থা বা পুলিশ গ্রেফতার করলেই পদ খোয়াতে হবে—এমন বিধান আসলে জনগণের রায়কে অপমান করা। এভাবে জনগণের ভোটকে অকার্যকর করে দেওয়া মানে গণতন্ত্রের গলা টিপে ধরা। কেন্দ্রের এনডিএ সরকারের প্রধান শরিক বিজেপি দেশের জনগণের অধিকার খর্ব করে এক স্বৈরতন্ত্রের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে দেশকে।
আজকের ভারতের বাস্তবতায় কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাগুলি স্বাধীন নয়, বরং ক্ষমতাসীন দলের হাতের যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার করে বিরোধী নেতাদের হয়রানি করা হচ্ছে অহরহ। এই আইন কার্যকর হলে একটি মিথ্যা অভিযোগ বা সাজানো তদন্তের ভিত্তিতে বিরোধী মুখ্যমন্ত্রীকে মুহূর্তে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। রাজ্যের জনমতের উপর কেন্দ্রীয় সরকারের স্বার্থ চাপিয়ে দেওয়ার জন্য এর চেয়ে বড় অস্ত্র আর হতে পারে না।
ভারতের শক্তি তার যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো। কেন্দ্র ও রাজ্য উভয়ের ক্ষমতার সীমা সংবিধান দ্বারা নির্ধারিত। কিন্তু এই বিল কেন্দ্রকে এমন ক্ষমতা দেবে যা সরাসরি রাজ্যের সার্বভৌমতায় হস্তক্ষেপ। নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীকে হঠিয়ে দিয়ে কেন্দ্রীয় শাসন চাপিয়ে দেওয়ার ফাঁদ এ আইনেই লুকিয়ে আছে। এটি কেবল একটি বিল নয়, এটি যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র।
যদি সত্যিই দুর্নীতি রোধ করাই লক্ষ্য হয়, তবে আদালতের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করুন, তদন্তকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করুন, নির্বাচনী অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা আনুন। কিন্তু না, সরকার সে পথে হাঁটছে না। কারণ দুর্নীতির নামে বিরোধীদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করার সুযোগই আসল উদ্দেশ্য। স্বচ্ছতার নামে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার এই খেলায় প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতা দখলের নোংরা রাজনীতি চলছে।
প্রস্তাবিত বিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে নয়, বরং গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। এটি জনগণের ভোটের উপর আঘাত, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার। জনগণের সতর্ক না হলে দুর্নীতি দমনের নামে কেন্দ্রের বর্তমান সরকার আরও এক ধাপ কর্তৃত্ববাদী সরকারে পরিণত হবে।


COMMENTS