উপসম্পাদকীয়:
মোদীর বিদেশনীতি ধাক্কা খেল ট্রাম্পের কাছে, চীন-ভারত নতুন সমীকরণে লাভবান কে?
মোদী-ট্রাম্প সম্পর্কের উষ্ণতা ভেঙে গিয়ে আজ বাণিজ্য যুদ্ধের সুর শোনা যাচ্ছে। শুল্ক-সংকট সামাল দিতে ভারত চীনের দিকে কতটা ঝুঁকছে? এই পরিবর্তিত সমীকরণে কে লাভবান হবে, আর কার ভাগ্যে আসবে কূটনৈতিক অস্থিরতা? সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন!
আবু জুনাইদ

ট্রাম্পের শুল্কে বন্ধুত্বের ফাটল

ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক বিগত এক দশকে কৌশলগতভাবে শক্তিশালী হলেও, ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের হঠাৎ শুল্কবৃদ্ধি সেই সমীকরণে ধাক্কা আনে। রত্ন, টেক্সটাইল থেকে শুরু করে সামুদ্রিক খাবার—ভারতের বহু রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মোদীর সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র সফরে ‘বাণিজ্য দ্বিগুণ করার’ প্রতিশ্রুতিই যেন এক মুহূর্তে ভেস্তে যায়। ভারত এই সিদ্ধান্তকে “অন্যায় ও অযৌক্তিক” আখ্যা দিয়ে প্রতিরোধের বার্তা দিয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—‘মোদি-ট্রাম্প বন্ধুত্ব’ আসলে কি ছিল কেবলমাত্র আড়ম্বর?
নতুন সমীকরণে চীন: সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা
কূটনৈতিক বরফ গলছে
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ঈয়ের দিল্লি সফরে সীমান্ত শান্তি, বাণিজ্য পুনরুজ্জীবন ও পরিবহন চুক্তি—সব মিলিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নরম সুর শোনা যাচ্ছে। সীমান্তে উত্তেজনা প্রশমিত করার আশ্বাসও চীনের পক্ষ থেকে এসেছে।
পণ্যের সরবরাহে চীনের সুবিধা
ভারতের শিল্পক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ফার্টিলাইজার, বিরল খনিজ উপাদান ও ফার্মাসিউটিক্যাল কাঁচামাল মূলত চীন থেকেই আসে। ট্রাম্পের শুল্কের ধাক্কায় বিকল্প উৎসের খোঁজে থাকা ভারতকে চীন আপাতত তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিতে পারে।
আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মে একসাথে
SCO ও BRICS-এর মতো আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মে চীন-ভারতের আলোচনার পরিমাণ বাড়ছে। এটি দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সমন্বয় বাড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কিন্তু কতটা বিশ্বাসযোগ্য চীন?
ভারতের কূটনৈতিক মহল মনে করে—চীনের সঙ্গে সম্পর্ক “managed rivalry” ছাড়া আর কিছু নয়। সীমান্ত বিরোধ, পাকিস্তানকে চীনের অকুণ্ঠ সমর্থন এবং দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার ভারতের জন্য সবসময় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
অতএব, অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়লেও কৌশলগত সতর্কতা বজায় রাখা ভারতের জন্য অপরিহার্য। চীনকে সম্পূর্ণরূপে নির্ভরযোগ্য অংশীদার ভাবার সুযোগ নেই।
যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ভারতের স্বাতন্ত্র্য কূটনীতি
ভারত কেবল চীন-নির্ভর নয়। ট্রাম্পের শুল্কের পরও ভারত রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি চুক্তি জোরদার করেছে, আর QUAD ও ইন্দো-প্যাসিফিক অ্যালায়েন্সে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই যুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ, মোদী সরকার “স্বাধীন, বহুমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ” কূটনীতি অনুসরণ করছে।
এখানেই ভারতের আসল শক্তি—কোনও একক শক্তিধর রাষ্ট্রের ছায়ায় না থেকে নিজস্ব অবস্থানকে দৃঢ় করা।
ভারত কারও ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ নয়, বরং বহুমুখী অংশীদারিত্বের মাধ্যমে স্বাধীন শক্তি হয়ে উঠতে চায়। সুতরাং, ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্তে ভারতের বিদেশনীতি সাময়িক ধাক্কা খেলেও, সময়ই বলবে ভারত কতটা ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে। অপরপক্ষে চীনের সঙ্গে ভারতের নতুন সম্পর্ক কতটা সফল হবে সেকথা বলার সময় আসেনি। বারবার সীমান্ত নিয়ে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়েছে। সম্পর্ক স্থায়ী হলে অবশ্যই দুদেশই উপক্রিত হবে একথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

COMMENTS